Skip to content

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মের অবদান

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মের অবদান

বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে আমরা অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য এবং পরিবেশের ক্ষেত্রে অনেক দূর এগিয়েছি। তবে, টেকসই উন্নয়নের পথে আমাদের সামনে এখনও অনেক চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য, এবং সামাজিক বৈষম্যের মতো সমস্যা সমাধানে তরুণ প্রজন্মের ভূমিকা অপরিসীম। বাংলাদেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ তরুণ, এবং তাদের শক্তি, সৃজনশীলতা ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা দেশের ভবিষ্যৎ গঠনে প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে। এই লেখায় আমরা আলোচনা করব কীভাবে তরুণরা টেকসই উন্নয়নে অবদান রাখছে এবং বাস্তব উদাহরণের মাধ্যমে তাদের কাজ তুলে ধরব।

তরুণ প্রজন্ম: বাংলাদেশের সম্পদ

বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৩০% এর বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে বাংলাদেশে প্রায় ৪ কোটির বেশি তরুণ রয়েছে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী শুধু শ্রমশক্তি নয়, বরং উদ্ভাবন ও পরিবর্তনের বাহক। টেকসই উন্নয়ন বলতে আমরা এমন একটি প্রক্রিয়া বুঝি যা বর্তমানের চাহিদা পূরণ করে, কিন্তু ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সম্পদ ও সুযোগ রক্ষা করে। তরুণরা এই ভারসাম্য বজায় রাখতে পারে, কারণ তারাই আগামী দিনের নেতৃত্বে আসবে।

শিক্ষা ও সচেতনতা বৃদ্ধি

টেকসই উন্নয়নের প্রথম পদক্ষেপ হলো সঠিক শিক্ষা ও সচেতনতা। বাংলাদেশের তরুণরা বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ এবং অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে জলবায়ু পরিবর্তন, দারিদ্র্য হ্রাস এবং লিঙ্গ সমতার মতো বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করছে। উদাহরণস্বরূপ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিয়া রহমান নামে এক তরুণী গত বছর একটি প্রকল্প শুরু করেছিলেন। তিনি তার এলাকার স্কুলে গিয়ে শিশুদের পরিবেশ সংরক্ষণের গুরুত্ব বোঝান। তার এই উদ্যোগে প্রায় ৫০০ শিক্ষার্থী জড়িত হয় এবং তারা বৃক্ষরোপণ ও প্লাস্টিক বর্জনের শপথ নেয়। এমন ছোট ছোট পদক্ষেপই সমাজে বড় পরিবর্তন আনে।

প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ব্যবহার

তরুণরা প্রযুক্তির সঙ্গে অত্যন্ত পরিচিত। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও অ্যাপস ব্যবহার করে টেকসই সমাধান বের করছে। চট্টগ্রামের তরুণ উদ্যোক্তা রাকিব হোসেন একটি স্টার্টআপ শুরু করেছেন, যেখানে তিনি কৃষকদের জন্য স্মার্ট ইরিগেশন সিস্টেম তৈরি করেন। এই প্রযুক্তি পানির অপচয় কমায় এবং ফসলের উৎপাদন বাড়ায়। তার এই উদ্যোগ এখন পর্যন্ত ২০০ কৃষক পরিবারের জীবনযাত্রার মান উন্নত করেছে। এছাড়া, ঢাকার তরুণরা বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য রিসাইক্লিং প্রকল্প চালাচ্ছে। “ওয়েস্ট টু ওয়েলথ” নামে একটি প্রকল্পে তারা প্লাস্টিক বর্জ্য থেকে টাইলস তৈরি করছে, যা পরিবেশ দূষণ কমাচ্ছে এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে।

পরিবেশ রক্ষায় তরুণদের ভূমিকা

বাংলাদেশে পরিবেশ রক্ষা একটি জরুরি বিষয়। ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় ২৫০ মিলিয়ন টন বর্জ্য উৎপন্ন হয়, যার বেশিরভাগই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না। তরুণরা এই সমস্যা সমাধানে এগিয়ে আসছে। সিলেটের “গ্রিন সেভার্স” নামে একটি তরুণ সংগঠন গত পাঁচ বছরে ১০,০০০ গাছ রোপণ করেছে এবং স্থানীয় নদী পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালিয়েছে। তাদের একজন সদস্য, আলিম উদ্দিন, বলেন, “আমরা চাই আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম একটি পরিচ্ছন্ন পরিবেশে বড় হোক।” এছাড়া, অনেক তরুণ সামাজিক মাধ্যমে “প্লাস্টিক ফ্রি বাংলাদেশ” ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে, যা হাজার হাজার মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে অবদান

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ছাড়া টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। বাংলাদেশে তরুণরা ই-কমার্স, ফ্রিল্যান্সিং এবং টেক-স্টার্টআপের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। বাংলাদেশ ফ্রিল্যান্সার ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রায় ৬ লাখ তরুণ ফ্রিল্যান্সার রয়েছে, যারা বছরে ১০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি আয় করছে। এছাড়া, গ্রামীণ তরুণরা ক্ষুদ্র উদ্যোগের মাধ্যমে অর্থনীতিতে যোগ দিচ্ছে। যশোরের ফারজানা আক্তার নামে এক তরুণী তার গ্রামে একটি হস্তশিল্প ব্যবসা শুরু করেছেন। তিনি ২০ জন নারীকে প্রশিক্ষণ দিয়ে কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং তাদের পণ্য এখন ঢাকার বাজারে বিক্রি হচ্ছে।

সামাজিক সমতা ও ন্যায়বিচার

টেকসই উন্নয়নের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক সমতা। তরুণরা লিঙ্গ সমতা ও শিক্ষার অধিকারের জন্য কাজ করছে। খুলনার “ইয়ুথ ফর চেঞ্জ” নামে একটি সংগঠন স্লাম এলাকায় বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান করছে। তাদের প্রতিষ্ঠাতা রিফাত হোসেন বলেন, “আমি দেখেছি আমার এলাকার অনেক শিশু স্কুলে যেতে পারে না। আমি চাই তাদের জীবন বদলে দিতে।” তার এই উদ্যোগে ১৫০ শিশু এখন নিয়মিত পড়াশোনা করছে। এছাড়া, তরুণরা নারীদের ক্ষমতায়ন ও শিশুশ্রম বন্ধে সামাজিক মাধ্যমে ক্যাম্পেইন চালাচ্ছে।

চ্যালেঞ্জ ও সমাধান

তরুণদের এই অবদান সত্ত্বেও শিক্ষার গুণগত মান, বেকারত্ব এবং সুযোগের অভাব তাদের পথে বাধা। জাতীয় পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে তরুণদের বেকারত্বের হার প্রায় ১২%। তবে, সরকারের সঙ্গে সহযোগিতা, দক্ষতা উন্নয়ন প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার সমর্থন এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্র্যাকের একটি প্রোগ্রামে ৫০,০০০ তরুণকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, যারা এখন নিজেদের পায়ে দাঁড়িয়েছে।

উপসংহার

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়নে তরুণ প্রজন্মই মূল শক্তি। তাদের শিক্ষা, প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। সাদিয়া, রাকিব, ফারজানা এবং রিফাতের মতো তরুণরা প্রমাণ করে যে ছোট উদ্যোগও বড় প্রভাব ফেলতে পারে। তবে, তাদের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে সরকার, সমাজ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন জরুরি। তরুণদের হাতে রয়েছে একটি সবুজ, সমৃদ্ধ ও ন্যায়ভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার চাবিকাঠি। আমরা সবাই তাদের পাশে থাকি এবং তাদের উৎসাহিত করি।

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x